সেই ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারব না- ড. আতিউর রহমান

জামালপুর দর্পণঃ

আমার জন্ম জামালপুর জেলার এক অজপাড়াগাঁয়ে। আমার বাবা ছিলেন একজন অতি দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক। আমরা পাঁচ ভাই ও তিন বোন। অভাব-অনটনের মধ্যেই আমাদের বেড়ে ওঠা। অনেক সময় খাবার জুটত না, পরনের কাপড়ও ছিল না। দারিদ্র্য কী জিনিস, তা আমি ছোটবেলা থেকেই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি।

আমার মা সামান্য লেখাপড়া জানতেন। তাঁর কাছেই আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি। পরে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। কিন্তু পরিবারের অভাবের কারণে তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমাকেও রোজগারের পথে নামতে হয়।

আমাদের একটি গাভী ও কয়েকটি খাসি ছিল। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেগুলো মাঠে চরাতাম। বিকেলে গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে বিক্রি করতাম। এভাবে কিছুদিন চলার পর দুধ বিক্রির টাকা থেকে ৮ টাকা জমিয়ে একটি পান-বিড়ির দোকান দিই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে বসে থাকতাম। পড়াশোনা আবার শুরু করব, সেই স্বপ্নটাও তখন প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম।

একদিন বড় ভাই বললেন, স্কুলের মাঠে নাটক হবে। তাঁর সঙ্গে নাটক দেখতে গেলাম। তখন আমার গায়ে দেওয়ার মতো কোনো জামা ছিল না। খালি গায়ে লুঙ্গি পরে স্কুলে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে চারপাশের আনন্দময় পরিবেশ দেখে আমার মনে হলো, আমিও তো আর সবার মতো হতে পারতাম! সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে আবার স্কুলে ফিরতে হবে।

বাড়ি ফেরার পথে বড় ভাইকে বললাম, ‘আমি কি আবার স্কুলে যেতে পারি না?’ পরদিন ভাই আমাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। প্রধান শিক্ষকের কাছে আমার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক অবজ্ঞার সুরে বললেন, ‘সবাইকে দিয়ে কি লেখাপড়া হয়?’

কথাটা আমার মনে গভীরভাবে আঘাত করল। তবু বড় ভাইয়ের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার অনুমতি পেলাম।

পরীক্ষার আর মাত্র তিন মাস বাকি। বাড়িতে খাবার নেই, বই নেই, পড়াশোনার পরিবেশও নেই। তাই মাকে বললাম, আমি আমার একসময়ের সহপাঠী মোজাম্মেলের বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনা করব। মোজাম্মেলের মা আমাকে সাদরে আশ্রয় দিলেন। নতুন করে পড়াশোনা শুরু করলাম। প্রধান শিক্ষকের সেই কথাটি বারবার মনে পড়ত, আর আমার মনে জেদ চেপে বসত—আমাকে ভালো ফল করতেই হবে।

পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন জানতে পারলাম, আমি প্রথম হয়েছি! বড় ভাই আনন্দে কেঁদে ফেললেন। সারা গ্রামে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। আমার বাবা নতুন বই কেনার জন্য একটি খাসি বিক্রি করে দিলেন। এরপর থেকে আমার জীবন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।

পড়াশোনায় ভালো ফল করার কারণে শিক্ষকদের স্নেহ ও সহযোগিতা পেতে থাকলাম। একসময় গ্রামের মফিজউদ্দিন চাচার বাড়িতে থাকার সুযোগ হলো। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে দিঘপাইত জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হলাম।

আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে উঠব, তখন চাচা একদিন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন দেখালেন। আবেদন করলাম এবং পরীক্ষায় অংশ নিলাম। কিছুদিন পর চিঠি পেলাম, আমি নির্বাচিত হয়েছি। কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য ঢাকায় যাওয়ার মতো ভালো পোশাকও আমার ছিল না। স্কুলের কেরানি কানাই লাল বিশ্বাসের কাছ থেকে একটি প্যান্ট ধার করে চাচার সঙ্গে ঢাকায় গেলাম।

চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর জানতে পারলাম, মাসে ১৫০ টাকা বেতন দিতে হবে। এর মধ্যে ১০০ টাকা বৃত্তি পাওয়া যাবে, বাকি ৫০ টাকা পরিবারকে দিতে হবে। কিন্তু আমার পরিবারের পক্ষে প্রতি মাসে ৫০ টাকা জোগাড় করাও অসম্ভব ছিল।

আমি যখন দিশেহারা, তখন আমার শিক্ষক ফয়েজ মৌলভী স্যার এগিয়ে এলেন। তিনি দুই সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে নিয়ে হাটে গেলেন। দোকানে দোকানে গিয়ে আমার অবস্থার কথা জানিয়ে সাহায্য চাইলেন। কেউ চার আনা, কেউ আট আনা, কেউ এক-দুই টাকা করে দিলেন। এভাবে ১৫০ টাকা সংগ্রহ হলো। আত্মীয়দের সহযোগিতায় সেই অর্থ নিয়ে আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলাম।

কলেজের অধ্যক্ষ এম. ডব্লিউ. পিট স্যার আমার অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে উদ্যোগ নিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় আমার সম্পূর্ণ বৃত্তির ব্যবস্থা হলো। এরপর আর আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কঠোর পরিশ্রম করে এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করলাম। ধীরে ধীরে উচ্চশিক্ষার পথও খুলে গেল।

জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পরও আমি আমার অতীত ভুলিনি। আমার জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও ত্যাগ। পরবর্তীকালে নিজের এলাকায় স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি, সাধ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।

কিন্তু আজও আমার মনে হয়, হাটে হাটে ঘুরে সাধারণ মানুষ যে ১৫০ টাকা তুলে দিয়েছিলেন, সেই ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারব না। আমার সারা জীবন উৎসর্গ করলেও সেই ঋণ শোধ হবে না!

Share on Google Plus

About সাদ্দাম হোসেন

0 $type={blogger}:

Post a Comment