আলমাছ হোসেন আওয়ালঃ
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেন থমকে গিয়েছিল হুরমুজ আলী পানাইতের পথচলা। বয়সের ভার, দারিদ্র্যের কষাঘাত আর অসুস্থতার যন্ত্রণা মিলিয়ে প্রতিটি দিন তার কাছে হয়ে উঠেছিল একেকটি দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। ভাঙা পাঁজরের ব্যথা বুকে নিয়ে, চিকিৎসার কোনো সুযোগ ছাড়াই তিনি বেঁচে ছিলেন নিঃশব্দ কষ্টে। চলার শক্তি হারিয়ে প্লাস্টিকের একটি চেয়ারকে ভরসা করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতেন জীবনের পথে। এমন হৃদয়স্পর্শী জীবনসংগ্রামের প্রচারিত হওয়ার পর অবশেষে তার পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের বেনুয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা মৃত বাহেজ পানাইতের ছেলে হুরমুজ আলী পানাইতের মানবেতর জীবনযাপন ও চিকিৎসাহীন দুর্দশা নিয়ে গত বুধবার রাতে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একটি বিশেষ মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসক মো. ইউসুফ আলীর নজরে এলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুসাইন রবিবার হুরমুজ আলীর বাড়িতে গিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ আর্থিক সহায়তা এবং চলাচলের সুবিধার্থে একটি ওয়াকার হস্তান্তর করেন। দীর্ঘদিনের অসহায়ত্বের মধ্যে এই সহায়তা তার জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আত্মমর্যাদাবোধে দৃঢ়চেতা হুরমুজ আলী সারাজীবন পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি। কয়েক বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আরও একাকী হয়ে পড়েন। দাম্পত্য জীবনে তিন সন্তান থাকলেও তাদের আর্থিক অবস্থাও নাজুক। ফলে বাবার চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
জানা যায়, প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস আগে ভ্যানগাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন হুরমুজ আলী। দুর্ঘটনায় তার পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। কিন্তু অর্থাভাবে কোনো চিকিৎসা করাতে পারেননি তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। একসময় যে মানুষটি নিজের শ্রমে জীবন চালিয়েছেন, তাকেই পরে চলাফেরার জন্য প্লাস্টিকের একটি চেয়ারকে অবলম্বন করতে হয়েছে।
নাগরিক টিভির প্রতিবেদনে উঠে আসে তার নীরব আর্তনাদ, বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস এবং বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে যায় তার দোরগোড়ায়।
সহায়তা গ্রহণকালে আবেগাপ্লুত হুরমুজ আলী বলেন, “আমি কোনোদিন মানুষের কাছে হাত পাতিনি। অনেক কষ্টে দিন কাটছিল। আমার খবর দেখে যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, মহান আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।”
এলাকাবাসী বলছেন, একজন অসহায় মানুষের জীবনে এই সহায়তা কেবল আর্থিক সহযোগিতা নয়; এটি মানবিক দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং প্রশাসনের দ্রুত সাড়া প্রমাণ করেছে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব।
তবে স্থানীয়দের মতে, হুরমুজ আলীর কষ্টের গল্প এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। তার প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। তারা আশা করছেন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি কিছুটা স্বস্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।
হুরমুজ আলীর গল্প কেবল একজন মানুষের দুঃখগাথা নয়; এটি আমাদের সমাজের প্রান্তিক মানুষের নীরব সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। আর সেই গল্পই আবারও মনে করিয়ে দেয়—সংবাদমাধ্যম যখন মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, তখন অনেক সময় একটি প্রতিবেদনই বদলে দিতে পারে একজন অসহায় মানুষের জীবনের গতিপথ।

0 $type={blogger}:
Post a Comment